মো. ইউসুফ আলী :
অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার সংক্রান্ত সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহে রাজধানী ঢাকায় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করা বয়স্ক ও একা থাকা ব্যক্তিদের মৃত্যুর খবর উঠে এসেছে। এ ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যু ও উদ্ধার অভিযান নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর পল্লবী ও মুগদা এলাকায় মাত্র চার দিনের ব্যবধানে তিনজন মানুষের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দুজন নারী এবং একজন পুরুষ। কেউ বিছানায়, কেউ ঘরের মেঝেতে, আবার কেউ ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন দিনের পর দিন। মৃত্যুর পরও তাদের খোঁজ নিতে আসেননি কেউ । ঘটনাগুলো শুধু কয়েকটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নয় বরং নগরজীবনের ক্রমবর্ধমান একাকীত্ব, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের মতে, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বল হয়ে পড়া মানুষের জীবনে এমন এক নিঃসঙ্গতার জন্ম দিচ্ছে, যেখানে মৃত্যুর পরও কেউ খোঁজ নেয় না।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সর্বশেষ গত ৫ জুন শুক্রবার সাতক্ষীরায় অহিদা সুলতানা শিমু (৩৮) নামের এক বিধবা নারীর অর্ধগলিত গলিত লাশ তার ঘরের বিছানা থেকে উদ্ধার করেছে সদর থানা পুলিশ। এছাড়া ৪ জুন বৃহস্পতিবার বিকেলে রজধানীর শহরতলী কেরানীগঞ্জের কদমতলী গোলচত্বর এলাকার দ্বীন ফার্নিচার কারখানার তৃতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে মো. বাবু (৫৫) নামে এক ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাছাড়া গত ২ জুন রাতে রাজধানীর উত্তর মুগদার আহমদবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর হোসেইন শুভর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে ৩১ মে রাতে রাজধানীর পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলার একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় নূরজাহান বেগমের গলিত মরদেহ। সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই ঘটনাটি। কারণ তার চার সন্তানই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে একজন যুগ্ম সচিব, মেজ ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, ছোট ছেলে কানাডাপ্রবাসী এবং মেয়ে একটি স্কুলের শিক্ষক। কিন্তু সেই মায়ের মৃত্যুর পর কয়েকদিন কেটে গেলেও কেউ তার খোঁজ নেননি। রাজধানীর কদমতলী থানাধীন জুরাইনে শারমিন আক্তার শেলী (২৭) নামের এক নারী আনসার সদস্যের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। সংবাদমাধ্যম গুলোতে প্রকাশিত এসব ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া, ময়না তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন এবং নিঃসঙ্গ বয়স্কদের সুরক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ যেন একাকী জীবনের একেকটা নি:শব্দ সমাপ্তি। এ যেন একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি। আমাদের সমাজ যত আধুনিক হচ্ছে, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রা যত ব্যস্ত হচ্ছে, ততই যেন পারিবারিক বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। আজকের পৃথিবীতে মানুষ শত শত মাইল দূরের খবর মুহূর্তেই জানতে পারে, কিন্তু নিজের মা-বাবার খোঁজ নিতে অনেক সময় দিন, সপ্তাহ, এমনকি মাস পার করে দেয়। অর্থনৈতিক সাফল্য, উচ্চপদ, সামাজিক মর্যাদা সবই অর্জিত হচ্ছে, কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক মূল্যবোধ।
আমাদের সংস্কৃতিতে মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, যতœ ও দায়িত্ব পালনকে শুধু নৈতিক কর্তব্য নয়, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সা¤প্রতিক সময়ে বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি অবহেলা, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক প্রবীণ মানুষ জীবনের শেষ বয়সে এসে নিজেদের পরিবারেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছেন। সন্তানদের কাছে তাঁরা যেন দায়িত্বের চেয়ে বেশী বোঝা হয়ে দেখা দিচ্ছেন। তবে এ ঘটনায় কেবল একটি পরিবারকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমাদের প্রতিবেশী সমাজও কি তার দায়িত্ব পালন করেছে ? সাত দিন ধরে একজন বৃদ্ধা নারীর খোঁজ কেউ নেয়নি এটিও আমাদের সামাজিক সম্পর্কের দুর্বলতার প্রমাণ। একসময় পাড়া-প্রতিবেশীরা একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার ছিলেন। এখন শহুরে জীবনে পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে, সেটিও অনেকের জানা থাকে না। ব্যক্তি-কেন্দ্রিক জীবনের এই প্রবণতা সমাজকে আরও বিচ্ছিন্ন ও সংবেদনহীন করে তুলছে। জীবনের নির্মম সত্য হলো, আজ যারা মা-বাবাকে অবহেলা করছেন, একদিন তাঁরাও বার্ধক্যে উপনীত হবেন। সময়ের চাকা ঘুরে ফিরে আসে। সন্তানরা দেখে শেখে। যারা নিজেদের বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বহীনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও একই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তখন হয়তো তাঁদেরও অপেক্ষা করতে হবে একটি ফোন কলের জন্য, একটি দরজার কড়া নাড়ার জন্য, কিংবা কারও একটু খোঁজ নেওয়ার জন্য।
সাম্প্রতিক সময়ের এই নিঃসঙ্গ মৃত্যু কেবল একটি মৃত্যুর সংবাদ নয়। এটি আমাদের পরিবার, সমাজ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি একটি কঠিন সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তা যদি আমরা আজও না বুঝি, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক নূরজাহান বেগম নিঃশব্দে হারিয়ে যাবেন, আর আমরা সভ্যতার অহংকারে দাঁড়িয়ে নিজেদের মানবিক পরাজয়ের ইতিহাস লিখতে থাকব। আসলে আধুনিক সমাজব্যবস্থায় যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে যে ক’টি জিনিস, তারমধ্যে বৃদ্ধ বয়সে নি:ষঙ্গতাও একটি। তবে অনলাইন আসক্তি, সমাজ বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি কারণে আমাদের এখানেও এখন এই নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব এবং তার পরিণতিতে আত্মহত্যার মতো চরম প্রবণতা বাড়ছে দিনকে দিন। আর এই বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্বের চরম রূপ আমরা এবার দেখতে পেলাম। আমরা এর প্রতিকার চাই। চাই এমনসব একাকীত্বের অবসানও।
- দৈনিক আমাদের কণ্ঠ: প্রকাশিত সংবাদ, মতামত সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম