এম মতিউর রহমান মামুনঃ
‘রথীন্দ্রনাথের নাম চিহ্নিত কালীগ্রামের এই বিদ্যালয়ের আমি উন্নতি কামনা করি। এখানে ছাত্র এবং শিক্ষকদের সম্বন্ধ যেন অকৃত্রিম স্নেহের এবং ধৈর্যের দ্বারা সত্য ও মধুর হয়—এই আমার উপদেশ।
শিক্ষাদান উপলক্ষে ছাত্রদিগকে শাসন পীড়নে অপমানিত করা অক্ষম ও কাপুরুষের কর্ম—একথা সর্ব্বদা মনে রাখা উচিত। এরূপ শিক্ষাদান প্রণালী—শিক্ষকদের পক্ষে আত্মসম্মানের হানিজনক। সাধারণত আমাদের দেশে অল্পবয়স্ক বালকগণ প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষকদের নির্মম শাসনের উপলক্ষ হইয়া থাকে—একথা আমার জানা আছে। সেই কারণেই সতর্ক করিয়া দিলাম।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিসরে নিজ পুত্রের নামে বিদ্যালয় স্থাপন করে ছাত্রা-শিক্ষের উদ্দেশ্য উপরোক্ত আশির্বাণী লিখেছেন। ১৯৩৭ সালে পতিসর থেকে ফিরে মৃত্যুর কয়েক বছর আগেও কবিগুরু বলেছেন, ‘শ্রেষ্ঠত্বের উৎকর্ষে শিক্ষা সব মানুষের অধিকার। গ্রামে গ্রামে মানুষকে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। সবার চেয়ে বড় দরকার শিক্ষার সাম্য।’ (পল্লীপ্রকৃতি)।

পতিসরের অশিক্ষিত প্রজাদের বাস্তব অবস্থা দেখে ইন্দ্রিরা দেবী’কে অপর এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘কালীগ্রামের সহজ সরল অল্প আয়ের সল্প শিক্ষিত মানুষ গুলোর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অনুভবের মধ্যে দিয়ে কবি লিখেছেন ‘কোথায় প্যারিসের আর্টিস্ট-সম্প্রদায়ের উদ্দাম উন্মত্ততা আর কোথায় আমার কালীগ্রামের সরল চাষী প্রজাদের দুঃখ দৈন্য-নিবেদন!…এদের অকৃতিম ভালোবাসা এবং এদের অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জ্বল আসে।…বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি দেশ জোরা বৃহৎ পরিবারের লোক”। (ছিন্নপত্রাবলি ১১১সংখ্যক চিঠি
এক কথায় তাঁর পূর্বাপর লক্ষ্য গ্রামবাসীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক উন্নয়ন এবং গ্রাম ও নগরের বৈষম্য হ্রাস করা, গ্রাম যেন শহরের উচ্ছিষ্টভোজী না হয়। সেই লক্ষ্যে নিজস্ব জমিদারির পতিসরে এম, ই স্কুল (মাইনর স্কুল) স্থাপন করে এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের কাজ শুরু করেছিলেন। মাটির দেয়ালের টিন-টালির ছাউনিতে নির্মান করা হয় বিদ্যালয়ের ভবন।
‘শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হননি বরং হাতে কলমে শিক্ষাদান করেছিলেন’।
(রবি জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল ২খন্ড পৃষ্ঠা ৩১২)। শুধু তাই নয় কাছারি বাড়ির পিছনে মাটির দেওয়ালে ছাত্রাবাসও নির্মান করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৩০ বর্গমাইল আয়তনের কালীগ্রাম পরগনার ৬০০টি গ্রামের সাধারণ মানুষের শিক্ষার কথা বিবেচনা করে অবৈতনিক পাঠশালাও চালু করেন।
কবিগুরুর শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি বিশ্ব-ঐক্য ও প্রগতিশীল শিক্ষার কেন্দ্র স্থাপন করা, যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির মিলন ঘটবে এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেই লক্ষেই শান্তিনিকেতনে পাঠভবন প্রতিষ্ঠার পূর্বে পতিসরের মতো ঘোরপল্লীতে শিক্ষার কাজ শুরু করেছিলেন। (১৯০৫ সালে) পতিসরে বিদ্যালয় স্থানের পর পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটানোর জন্য কবিগুরু অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বই পত্র এনে শ্যালক নগেন্দ্রনাথের পতিসর স্কুলে গ্রন্থগার স্থাপন করেন। গবেষক’রা মনে করেন পতিসরের শিক্ষার সফলতা কাজে লাগিয়ে ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। পতিসরে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ সফল হয়েছিলেন তা কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনা থেকে অনুমান করা যায় ‘সেবার পতিসরে পৌঁছে গ্রাম বাসীদের অবস্থার অন্নতি দেখে মনপুলকিত হয়ে উঠলো। পতিসরের হাইস্কুলে ছাত্র আর ধরছেনা। দেখলুম-নৌকার পর নৌকা নাবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ছেলের দল স্কুলের ঘাটে। এমনকি, আট দশ মাইল দুরের গ্রাম খেকে ও ছাত্র আসছে। পড়াশুনার ব্যবস্থা প্রথম শ্রেনীর কোন ইস্কুলের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়। পাঠশালা, মাইনর স্কুল সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে’। হাসপাতাল ও ডিসস্প্রেনছাড়ির কাজ ভালো চলছে’।(পিতৃস্মৃতি রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর) ১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারী নিজ জমিদারি পতিসরে এসে কবি চারিদিকে ঘুরে ফিড়ে বেড়িয়েছেন, যেমন নাগর নদীতে ভেসে তেমনি নাগর নদীর পাড়ে, মাঠে এবং আসে পাশে হেটে। সে দেখার অভিজ্ঞতা নিঃশব্দে প্রভাব ফেলেছে কবির অন্তরে। তাই তাঁকে বলতে শুনি ‘তোমরা যে পার যেখানে পার এক-একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়া আশ্রয় লও। গ্রাম গুলিকে ব্যবস্থাবদ্ধ করো। শিক্ষা দাও, কৃষি শিল্প ও গ্রামের ব্যবহার-সামগ্রী সম্বন্ধে নতুন চেষ্টা প্রবর্তিত করো’ (রবীন্দ্ররচনাবলী ১০ম খন্ড পৃঃ ৫২০-২১)

এমনি এক আত্মিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ চরম সত্য উপলব্ধি করে বুঝতে পারেন এই এলাকার প্রজা চাষীদের দুঃখ দুর্দশার প্রধান কারণ অশিক্ষা।
সংগত কারনে কালীগ্রাম পরগনার রাতোয়াল ও কামতায় আরও দুটি উচ্চবিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বাংলার ঘোরপল্লীর মানুষকে শিক্ষিত করছিলেন তখন ভারতে স্কুল কলেজের সংখ্যা হাতেগোনা আর গ্রামাঞ্চলের মানুষের শিক্ষার কথা ভাবাই হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন গ্রামীণ জীবন ও জনপদের কথা, পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করার কথা।
আমাদের অনেক দিনের চাওয়া পতিসরের রবীন্দ্রনাথের সেই মাইনর স্কুল বর্তমান ‘কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন জাতীয় করণ করা হোক। তাতে বহুমূখি শিক্ষা ব্যাবস্থা চালুর কথা কিন্তু অমূলক নয়। আমাদের অনেক দেন-দরবারের ফলে বিদ্যালয়ের একটি মাটির ঘর সংরক্ষণ করে প্রত্নসম্পদ ঘোষণা করা হয়েছে যেখানে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যাবহৃিত অনেক নিদর্শন ও তার জমিদারির অনেক মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের জন্য ‘রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রহশালা নির্মান করেছি। দেশ-বিদেশি পর্যটক প্রতিদিন পতিসরে আসছে তাদের কথা বিবেচনা করে বাকি মাটির ঘরগুলো সংরক্ষণ করা জরুরী। ছাত্রাবাসের মাটির ঘরগুলো অনেক আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে কালের সাক্ষী বহন করছে একটি মাত্র ঘর তাও বিলুপ্তির পথে। চালে টিন বাতাশে উরে গেছে বৃষ্টির পানি পড়ছে ঘরে। যে কোন সময়ে এই মূল্যবান রবীন্দ্রস্মৃতি পাশের পুকুরে হারিয়ে যেতে পারে। ছাত্রাবাসের মাটির ঘরগুটি সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকে আমরা অনেক বার বলেছি কিন্তু কোন কাজ হয়নি। সাত্রাবাসের মাটির ঘর দ্রত সংস্কার ও সংরক্ষণ করতে হবে আর তা না হলে কিছুদিন পর হয়তো এই মূল্যবান রবীন্দ্রস্মৃতির কোন চিহ্নই থাকবেনা।
এম মতিউর রহমান মামুন
লেখক: রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা, রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রহশালা।