মো.ইউসুফ আলী:
ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। কবির ভাষায় আবার শরতে-হেমন্তে বাংলাদেশ। এদেশের প্রতিটি ঋতুই যেন আলাদা আলাদা রূপ আর বৈত্রিরের ভিন্নতায় ঘেরা। তাই ঋতু বৈচিত্রের এ পালা বদলের খেলায় প্রকৃতির খেয়ালেই যেন শরৎ এসেছে স্ব-মহিমায়। কাশফুল ফোটা শরতের আগমন শহরের ইট-পাথরের জীবনে বুঝতে পারা যেমন কঠিন, তেমনি প্রকৃতিতে এর সৌন্দর্যের মহিমা উপলব্ধি করাও খুব কষ্টের। এখানে নদী বা খালের তীরে সচারাচর কাশফুল ফুটতে দেখা না গেলেও শহরতলীর বিভিন্ন অঞ্চলের নতুন মাটিতে ফুটে ওঠা কাশফুল কিন্তু ঠিকই জানিয়ে দেয় এখন শরৎ এসেছে।
ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। এখন শরৎকাল তাই শরতে হেমন্তে বাংলাদেশ। যদিও ভাদ্র ও আশি^ন এই দুই মাস মিলে শরৎকাল সে ক্ষেত্রে ভাদ্র শেষ হয়ে আশি^নের এই শুরুর সময়ে দিনের বেলা আবহাওয়ায় গরমের ভাব থাকলেও রাতে তেমন একটা নেই। তার বদলে রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথেই বইতে শুরু করেছে ফুরফুরে বাতাস। রোদের তেজেও যেন কিছুটা শালীনতা এসেছে। অন্যদিকে আকাশের রঙ্গেও মনে হয় নীলের পরিমাণ বেড়েছে। এমন আবহাওয়াই জানান দিচ্ছে শরৎ এসেছে। আর শরতের এ আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনযাপনেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। বিশেষ করে খাওয়া-দাওয়া বা চলাফেরায়।
তবে খাওয়া-দাওয়া বা চলাফেরার প্রসঙ্গের আগে আসুন চোখ রাখি শরতের প্রকৃতিতে। শরৎ যেন অনেকটা শুভ্রতারই উৎসব। আর এ উৎসবের অন্যতম প্রতীক হিসেবে কাশফুলের বন বা কাশবন অতি পরিচিত দৃশ্য। এটা শরতের ফুল। শরৎ মানেই আকাশে সাদা মেঘ, গাঢ় নীল আকাশ আর নদীর চরে চরে কাশফুল। তাকে ঘিরে থাকা ফড়িং, মেঘ আর হিমহিম বাতাস শরৎকালকে মহিমাময় করে তোলে। শরতে কাশবনের পাশে সাদা শাড়ি, নীল পাড়, খোঁপায় বেলি ফুলের মালা, হাতে বকুল ফুল আর শরতের বাতাসে উড়ু উড়ু শাড়ির আচঁলে নারী হয়ে ওঠে অনন্যা, অপরূপা। শরতে প্রকৃতির এ উৎসবের পাশাপাশি শরতের সবচেয়ে বড় উৎসব হল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা বা শারদীয় দুর্গাৎসব। সনাতন ধর্মীদের প্রধান বার্ষিক উৎসব। সাধারণত শরতের দ্বিতীয় মাস আশ্বিনে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
নদীর তীরে কিংবা খালবিলের পাড়ে কাশফুলের দোল খেলা যেন শরতের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তবে ইট-পাথরের এ শহরে নদীর তীর বা খালবিল যেমন কম বা নেই, তেমনি নেই কাশবনও। কিন্তু গ্রামে নদীর পাড়ে ঠিকই চোখে পড়ে। অবশ্য এখন তো আমাদের নদীর সংখ্যাও কম। অন্যদিকে আকাশ ছোঁয়া দালানের জন্য তুলার মতো পেঁজা পেঁজা মেঘের ভেসে বেড়ানোও এ শহরের আকাশে তেমন দেখা যায় না। তবে এ শহরে না হোক, আশপাশে বা গ্রামের আকাশে ঠিকই এর দেখা মেলে। শরৎকাল নিয়ে আমাদের কবি লেখকদের লেখার শেষ নেই। এ ঋতুর বৈশিষ্ট নিয়ে রচিত হয়েছে বহু গান ও কবিতা। যার অনেকটির সাথেই জড়িয়ে আছে কাশফুলের গল্প গাঁথা। রবিঠাকুর তার আমাদের ছোট নদী কবিতায় একটি নদীর বর্ণনা দিতে গিয়ে কাশফুলের উদ্ধৃতি টেনে লিখেছেন দুই ধারে কাশ বন ফুলে ফুলে সাদা। তিনি লিখেছেন-‘তোমায় দেখেছি শারদ প্রাতে’। রবীন্দ্র নাথের আরেকটি কবিতা- ‘এসেছে শরৎ’
এসেছে শরৎ হিমের পরশ/লেগেছে হাওয়ার পরে/সকাল বেলায় ঘাসের আগায়/শিশিরের রেখা ধরে। আমলকী বন কাঁপে যেন তার/বুক করে দুরু দুরু/পেয়েছে খবর পাতা খসানোর/সময় হয়েছে শুরু। শিউলির ডালে কুঁড়ি ভরে এলো/টগর ফুটিল মেলা/মালতীলতায় খোঁজ নিয়ে যায়/মৌমাছি দুই বেলা ।
কবি জীবনানন্দ দাশ প্রিয়তমাকে বর্ণনা করেছেন শরতের চরিত্রের সঙ্গে। অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন-শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথী কই…। আমাদের কবি মুহাম্মদ লোকমানুল হাসান শরৎ নিয়ে লেখা তার একটি কবিতায় লিখেছেন শরতের কাশফুল কানে গোজে কিশোরী। শরৎ নিয়ে এমন আরও অনেক লেখা আছে বিভিন্ন লেখকের। কেউ কেউ কাশফুলকে আবার উদ্ধৃতি দিয়েছেন সাদা বকের পালকের সাথেও। কখনও আবার বিজ্ঞাপন নির্মাতা নারীর দেহের কোমলতাকে তুলনা করেছেন কাশফুলের সাথে। মনোরম পরিবেশের কাশফুল ও কাশবন আবার প্রেমিক-প্রেমিকাদের অনেক পছন্দের জায়গা হিসেবে স্থান পায়।
রাজধানীর শহরতলী কেরাণীগঞ্জেও সে রকম বেশ কয়েকটি জায়গা সকলের নজর কেরেছে। তারমধ্যে রাজউকের ঝিলমিল আবাসন প্রকল্প একটি অন্যতম স্পটে পরিনত হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্প ও বিডিজির সাউথ টাউন প্রকল্প। এছাড়াও বাঘৈর, ব্রাম্মনকীর্ত্তা,জিয়া নগর,ঘাটারচর এলাকার বেশ কিছু অংশজুড়ে শোভাপাচ্ছে কাশফুল। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের পাশে ঝিলমিল ও বসুন্ধরা আবাসিকে এখন সাদা বকের পালকের মত কাশবনকে দুর দেখলে যে কারো মন জুড়িয়ে যাবে। বিশাল ও বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে এর অবস্থান হওয়ায় দুর থেকে এসব অঞ্চলগুলোকে দেখে মনেহয় শরতের মেঘমুক্ত আকাশের সাদা মেঘের ভেলা এসে এখানে নোঙর গেড়েছে। কিংবা কখনও কখনও তুলনা করা যেতে পারে মরু অঞ্চলের সাথেও। সে-যাই হোক কোটি মানুষের এই মেগাসিটি ঢাকার আশপাশে একটু পা ফেলে ঘুরে বেড়াবার ফুসরত যেখানে মেলা ভার সেখানে ঝিলমিলের মত খোলা জায়গা এখন এলাকাবাসীর কাছে মন-মুগ্ধকর হওয়ারই কথা। তাইতো ঈদের ছুটি কিংবা পূজোর ছুটিতে কেরাণীগঞ্জের এসব অঞ্চল পরিনত হয় মানুষের মিলন মেলায়।