পাতি নেতাদের দৌরাত্ম্য শেষ হবে কবে?

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

গোলাম মোছাব্বির-
দিন দিন বাংলাদেশের রাজনীতি হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে। যার ফলে সুশীল সমাজের লোকেরা রাজনীতি করতে পিছপা হচ্ছে। আর এই সুযোগে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামে শহরে, মহল­া বা ওয়ার্ডে পাতি নেতাদের আবির্ভাব ঘটেছে। স্থানীয় বা লোকাল পর্যায়ে পাতি নেতাদের দৌরাত্ম্যের ইতিহাস বহুকাল আগে থেকেই যা এখনও বিদ্যমান। তবে আগের দিনের পাতি নেতাদের এত দৌরাত্ম্য ছিল না। তারা যথেষ্ট সংযত ছিল। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক পাতি নেতাদের দৌরাত্ম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে যখন সুশীল সমাজ রাজনীতি করা থেকে বিরতি নিয়েছেন, তখন থেকেই এসব পাতি নেতার উত্থান ঘটে। কিন্তু বিগত দুই যুগে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে প্রতিটি সরকারের আমলেই এসব পাতি নেতাদের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে। বিশেষ করে পাড়ায়, মহল­ায়, ওয়ার্ডে এসব পাতি নেতাদের বিচরণ অতি মাত্রায় দেখা গেছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব পাতি নেতাদের কুকর্মে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো, পাশাপাশি গ্রহণযোগ্যতাও হারাচ্ছে। অতীতেও দেখা গেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো জনপ্রিয়তা হারিয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের পাতি নেতাদের জন্য। মূলত পাতি নেতাদের জন্যই রাজনৈতিক দলের দুর্নাম হয়এবং পিছিয়ে পড়ে রাজনৈতিক মাঠে।
বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে দেখা যায় সা¤প্রতিক গজিয়ে উঠা পাড়ায়, মহল্লায় ও ওয়ার্ডের পাতি নেতারা সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করছে নিজ দলের নাম ভাঙ্গিয়ে। যেহেতু পাতি নেতাদেরকে ঐরকম ভাবে কেউই দাম দেয় না বা মূল্যায়ন করে না, সেহেতু তারা দাম ও মূল্য পাওয়ার আশায় আরও বেশি অত্যাচারী ও ভয়ংকর হয়ে উঠে। পাতি নেতাগুলো নিজেকে বড় নেতা হিসেবে জাহির করতে আধিপত্য বিস্তার করে নিজ এলাকায় তাদের রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙ্গিয়ে। ফলে ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ অসহায় মানুষ। তাদের ভাবসাব দেখলে মনে হবে তারা শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের চেয়ে অধিক ক্ষমতাধর। তারা বিভিন্ন সময় নিজেদের ক্ষমতার জাহির করতে গিয়ে বিভিন্ন সাধারণ মানুষের বড় ধরনের ক্ষতি সাধন করছে। বলা যায় তাদের দৌরাত্ম্যে অসহায় হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ। তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, জমি দখল, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন অবৈধ কাজ’সহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া অধিকাংশ পাতি নেতারা শিক্ষিত নয়, আবার আর্থিকভাবেও স্বচ্ছলও নয়। তাই তারা টাকার লোভে যেকোন অপকর্ম করতেও দ্বিধা করছেন না। শুধু তাই নয়, একসময় বিগত সরকারের নাম ভাঙিয়ে অপকর্মে লিপ্ত সন্ত্রাসীদেরও শেল্টার দিচ্ছে সা¤প্রতিক গজিয়ে উঠা এসব রাজনৈতিক পাতিনেতারা। তাদের অপকর্মের কারণে তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতারাও বিব্রত হচ্ছে। এমন কি এসব পাতি নেতারা নিজেদের স্বার্থে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। ফলে তারা যে রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙ্গাচ্ছে সেই রাজনৈতিক দল দিন দিন সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। এছাড়া রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর লোকাল ও স্থানীয় কিছু রাজনীতিবিদের মধ্যে অহংকার ঢুকে গেছে। তাদের মনোভাব এরকম যে- আমি কি হুনুরে! এর ফলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি বিরক্ত হচ্ছে তাদের প্রতি। মূলত সারাদেশের গ্রামবাংলার রাজনৈতিক চিত্র প্রায় একই রকম। সব জায়গায় এমন রাজনৈতিক অসঙ্গতির জন্য কেমন যেন এক প্রকার অস্থিরতা বিরাজ করছে। বলা যায় রাজনীতির এমন অস্থির পরিবেশ জনমনে নীরব আতংক তৈরি করেছে। সবাই এখন এই অস্থির সময় থেকে বাঁচতে মরিয়া।
যাই হোক, এবার একটি গল্প বলে আজকের লেখা শেষ করছি। একবার আমার এক বন্ধুর এলাকায় ঘুরতে গিয়েছি। বন্ধুটির সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার মাঝখানে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ উঠলে সেই বন্ধুটি আমাকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি গল্প শোনায়। গল্পের মূল চরিত্র ছিল ওয়ার্ডের এক পাতি নেতা। তার মুখে শোনা বাস্তব সেই গল্পটি শেয়ার করছি। আমার বন্ধুর এলাকায় ওয়ার্ডের এক পাতি নেতা ছিল। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তার এলাকার এক পাতি নেতা একটি রাজনৈতিক দলের ওয়ার্ড সভাপতি পদে দাঁড়াবে। সেজন্য সেই পাতি নেতা একটি শুভেচ্ছা বক্তব্য লিখে ও তার ছবি দিয়ে পোস্টার ব্যানার বানিয়ে সভাপতি পদ চেয়ে এলাকার বিভিন্ন দেয়ালে দেয়ালে সেসব পোস্টার ব্যানার ফেস্টুন ঠাঙ্গিয়ে দিল। এই পোস্টার ব্যানার টাঙ্গানোর পর সেই পাতি নেতার ভাব এতই বেড়ে গেল যে কার সঙ্গে কি ব্যবহার করতে হবে সেই বিষয়টি ভুলে গেল। তার ভাবসাব এমন হল যে সে এলাকার শীর্ষ নেতা হয়ে গেছে। অথচ এলাকায় তার দুই পয়সার দামও নেই। কিন্তু সে এমন ভাবসাব নিয়ে চলাফেরা শুরু করলো তার রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙ্গিয়ে যে সে অনেক কিছু হয়ে গেছে। এই রকম ভাবসাব নিয়ে সে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার করা শুরু করলো। সব সময় সেই পাতি নেতা সবার সঙ্গে চড়া মেজাজ নিয়ে কথা বলে, যার তার সাথে যা ইচ্ছা তাইই খারাপ ব্যবহার করে। এতে করে এলাকার অধিকাংশ মানুষ সেই পাতি নেতার ব্যাপারে বিরক্ত হয়ে পড়ে। ফলে জনমনে সেই পাতি নেতা যে রাজনৈতিক দলের সমর্থক সেই দলের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা সেই এলাকায় কমতে থাকে। তাছাড়া ঐ পাতি নেতা বিচারসালিশে দুর্নীতি, জব্বর দখল, জুয়া আসরের সেল্টার ইত্যাদি বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। ফলে এলাকার অসহায় মানুষরা মনে মনে সেই পাতি নেতাকে বদদোয়া দিতে থাকে। কিছু ভুক্তভোগী তো বলেই ফেলে যে এই পাতি নেতাদের দৌরাত্ম্য শেষ হবে কবে? তাদের মতে এই পাতি নেতা এখনও অফিসিয়ালি পদ পাইনি তাতেই এই অবস্থা, যদি সে অফিসিয়াল পদ পেয়ে যায় তাহলে কি হবে তা আল­াহই জানে! তাই এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে অন্যদলে ভিড়তে থাকে তলে তলে। ফলে একটি ওয়ার্ড পাতিনেতার ক্ষমতার দম্ভে একটি রাজনৈতিক দলের গ্রহণযোগ্যতার অপমৃত্যু ঘটে।এই বাস্তব গল্প থেকে আমার শিক্ষা নিতে পারি যে, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের উচিত তৃণমূল থেকে ভাল ও সৎ সমর্থক যাচাই বাছাই করে তারপর গ্রাম ও ওয়ার্ড ভিত্তিক দলের পদ পদবী দেওয়া। তা না হলে ঐসব অযাচিত পাতি নেতাই যথেষ্ট একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দলকে ডুবাইতে। -লেখক, কলামিস্ট ও জার্নালিস্ট

 

 

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ