চিঠি নেই তবু আছে চিঠি চত্বর!

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

মো.ইউসুফ আলী-
ছোট্ট একটি শব্দ ‘চিঠি’। কিন্তু একটা সময়ে কি বিশাল আর ব্যাপক ছিল তার আবেদন। কত রোমাঞ্চ, কতভালো লাগা, ভালোবাসা, আদর আর আশীর্বাদে ভরা ছিল সেই চিঠিগুলো। কতশত সু-সংবাদ আর দু:সংবাদ বয়ে নিয়ে আসত এই চিঠি। চিঠির কথায় অনেকেরই বুকে হয়তো শুরু হয়েছে প্রজাপতির নাচন। কারওবা বুকের বাম পাশে মোচড় দিয়ে উঠেছে পুরোনো কোন ব্যথা। কারও পুরোনো কোন ক্ষতে শুরু হয়েছে নতুন রক্তক্ষরণ। কারন কাগজের বুকে ঘন কালো কালি দিয়ে লেখা সেই শরীরী চিঠির চেহারাই ছিল আলাদা। আমার মতো মধ্যবয়সের বা আমার চেয়েও দুই এক যুগ আগের মানুষেরা অবশ্যই আমার সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত হবেন। আজ আর সেই চিঠি নেই। তবু আছে চিঠি চত্বর।
আজ আমার মনটা খুবই নস্টালজিক হয়ে আছে। মন ফিরে গেছে দূরে, বহুদূরের সেই পুরোনো দিনগুলোতে। পুরোনো, সবুজ শেওলায় ঢাকা, ন্যাপথলিনের গন্ধে ভরা কাগুজে চিঠি আর ডায়েরি লেখার যুগে। এ যুগের আধুনিক মানুষ, কম্পিউটার এক্সপার্ট ছেলেমেয়েরা হয়তো নাক কুঁচকে বলবে, ‘চিঠি আর ডায়েরি লেখা? তাও আবার কাগজ কলম দিয়ে? হা হা হা, সময় কোথায়?” একেই বলে জেনারেশন গ্যাপ।
আধুনিক এ প্রযুক্তির যুগে মমতা আর ভালোবাসা যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। একটা সময় চিঠিই ছিল দূরের মানুষের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। প্রিয় মানুষের লেখা চিঠি মানুষ বারবার পড়তো। কখনো চুমো খেতো। চিঠির ভেতর খুঁজে পেত যেন সেই মানুষের ছায়া ও ছোঁয়া। চিঠি আসত নানা রঙ্গে,নানা সুবাস নিয়ে। নীল খামে, প্রিয়তমার চিঠি। চিঠির ভাঁজে অতি যতেœ রাখা থাকত শুকনো সুবাসিত ফুলের পাপড়ি। চিঠি আসত গোলাপ, বেলি বা বকুল ফুলের সুবাস নিয়ে। দুরু দুরু বুকে ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকা, কম্পিত হাতে খামটি হাতে নেওয়া, নিশ্বাস বন্ধ করে প্রতিটি লাইন বারবার পড়া, ভালোবাসার সেই শব্দমালা। চিঠি নিয়ে কবি, সাহিত্যিক লিখেছেন, কবিতা, গান, গল্প। যুগ যুগ ধরে সারা পৃথিবীর মানুষ, প্রতিটি ভাষায় কত কত চিঠি যে লিখেছে। তার কোনো হিসাব নেই। নিজেকে প্রকাশ করার জন্য। না বলা কথা বলার জন্য। অনুরাগ বা বিরাগ, সুখ বা দুঃখ, প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনে মানুষ সেই আদিকাল থেকে কত চিঠিই না লিখেছে।
যদিও দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে চিঠির আকার, আয়তন বা চেহারা গেছে পাল্টে। পাল্টে গেছে চিঠি পাঠানোর ধরন। পায়রার পায়ে সুতোয় বাঁধা চিঠি বা লণ্ঠন হাতে টুনটুন ঘণ্টা বাজিয়ে ছুটে চলা ডাক হরকরার বয়ে নেওয়া একটি চিঠির অপেক্ষায় মানুষ দিনের পর দিন কাটিয়ে দিয়েছে। পাঠানো সেই চিঠিটি হয়তো সময়মতো কাঙ্খিত প্রিয় মানুষটির হাতে পৌঁছোয়নি। হয়তো সুসংবাদটি আর জানা হয়নি। তার আগেই কেউ হারিয়ে গেছে। হয়তো ফুরিয়ে গেছে প্রয়োজন। তাইতো কোন কোন চিঠি হয়ে গেছে ইতিহাস অথবা চিঠি লিখে কেউ হয়েছেন ইতিহাস। চিঠির জন্য কত ব্যাকুল অপেক্ষা, আকুল প্রতীক্ষায় কেটে যেত মানুষের অমূল্য সময় আর জীবন। একটা সময়ে, চিঠি মানেই ছিল অপেক্ষা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই চিঠি আজ বিলুপ্ত প্রায়।
আমার মতো পুরোনো মানুষ, যারা খুব প্রাচীন না হলেও খুব আধুনিকও নই। আমরা হলাম এই দুই যুগের সেতুবন্ধন। তাই আজও আমরা সেই পুরোনোর জন্যই আপসোস করে মরি। আবার নতুনকেও স্বাগত জানাতে ভুলি না। চিঠি আর ডায়েরি দুটিই এখনো আমাদের মনে শিহরণ জাগায়। আহা চিঠি! আহা সেই লুকানো গোপন ডায়েরি! সেই মিষ্টি সাদা কাগুজে গন্ধভরা চিঠি আর ডায়েরিগুলো কোথায় হারিয়ে গেল। জানি আমার মতো অনেকেরই মনের মণিকোঠায় জমে আছে এই চিঠি বা ডায়েরি শব্দ দুটির সঙ্গে হাজারটা স্মৃতি। আজ সেই চিঠি নেই। কিন্তু আজও আছে চিঠি চত্বর। এ লেখা ও ছবি তারই স্মৃতি বহন করে।
আমাদের চোখ, কান, মন, মাথা এখন সদা ব্যস্ত। হাত বাড়ালেই ল্যান্ডফোন, সেলফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন। ইমেইল, মেসেঞ্জার, ভাইবার, ফেসবুক, স্কাইপ আর ফেসটাইম। মুখোমুখি বসে কথা বলা আর মুহূর্তেই চিঠি বা খবর পাঠানোর কি দারুণ সব সুযোগ। পৃথিবী এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। চাঁদ, তারা, ফুল, পাখিরা এখন আর আমাদের মন ভোলায় না। আর কাগুজে চিঠি? কাগজ কলম দিয়ে লেখার সময় কোথায় ?
তবুও হয়তো পুরোনো সেই হলদে হয়ে যাওয়া বিবর্ণ চিঠি বা পোস্টকার্ড আজও কারও কারও শাড়ির ভাঁজে। আলমারির ড্রয়ারে বা জুতোর বাক্সে পুরোনো ছবির সঙ্গে সযতেœ রাখা আছে। আজও মাঝে মাঝে কোন বিশেষ দিনে, নির্জন দুপুরে, ঘন বর্ষায় বা নির্ঘুম রাতে চিঠিগুলো বের করে হাত বুলাতে ইচ্ছে করে। ঘ্রাণ নিতে বা পড়তে গিয়ে বুক ভার হয়ে আসে, চোখের কোণ ভিজে যায়।
আহা চিঠি! সুবাসিত কাগজে প্রিয়তম চিঠি। আমরা কি পারি না একটু সচেতন হয়ে, আদর করে, ভালোবাসা দিয়ে একে আজন্ম কাল বাঁচিয়ে রাখতে? আসুন না আমরা খুব প্রিয় মানুষগুলোকে দু-একটা কাগজের চিঠি লিখে চমকে দিই। স্মরণীয় হয়ে থাক কিছু চিঠি। যা আপনার অবর্তমানে একদিন সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখবে। ড্রয়ার হতে খুলে পাতা উল্টিয়ে আপনার লেখা ডায়েরিটি স্পর্শ করে আপনাকে অনুভব করবে কাছের মানুষেরা। কিছু কিছু জিনিসের জন্য আমরা না হয় অতীতেই ফিরে যাই, প্রযুক্তিকে বুড়ো আঙ্গুলটি দেখাই।

লেখক- বার্তা সম্পাদক,দৈনিক আমাদের কন্ঠ

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
বিস্তারিত জানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ক্লিক করুন
Advertisement

দৈনিক আমাদের কণ্ঠ