মোঃসেলিম(শ্রীপুর) গাজীপুর :
লম্বায় বারো থেকে চোদ্দ ইঞ্চি চাপাই কোপাই মরিচ। প্রত্যেকটি গাছে ঝুঁলে আছে লাল সবুজ মরিচ। গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় মাটি ছুঁয়েছে মরিচ। প্রায় দুই ফুট উঁচু মরিচ গাছ। ইন্দোনেশীয় জাতের এ মরিচ চাষ দেশে এটাই প্রথম। ‘চাপাই-কোপাই’, ইন্দোনেশিয়ায় বেশ জনপ্রিয় এবং চায়নিজ রেস্তোরাঁগুলোতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনয়নের হায়াতখারচালা গ্রামের আতিকুরর রহমানের কাছ থেকে তিন বিঘা জমি লিজ নিয়েছেন চাইনিজ নাগরিক (উদ্যোক্তা) সেন জিয়েন গাও। ওই জমিতে ইন্দোনেশিয়ান জাতের চাপাই-কোপাই মরিচ চাষ করেছেন তিনি। প্রতি সপ্তাহে আড়াই থেকে তিন মন মরিচ খেত থেকে উঠে ঢাকায় পাঠানো হয়। গত ছয় মাস যাবত উদ্যোক্তা সেন জিয়েন গাওয়ের সাথে মরিচ ক্ষেতের পরিচর্যার কাজ করছেন স্থানীয় রাসেল-রাকিবা দম্পত্তি। রাসেল ৯০০ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী রাকিবা ৬০০ টাকা রোজে জমিতে চারা লাগানো থেকে শুরু করে সকল কাজ করে থাকেন। ক্ষেত থেকে উৎপাদিত মরিচ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে না। রাজধানীর বিভিন্ন চাইনিজ রেস্টুরেন্টগুলোতে চাপাই কোপাই মরিচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ওইসব রেস্টুরেন্টের চাহিদার কথা ভেবেই চাষ শুরু করে চাইনিজ এ উদ্যোক্তা। প্রথমবার পরীক্ষামূলক চাষেই ভালো ফলন আসায় চাহিদা বেড়েছে এ মরিচ চাষের। সরেজমিন ক্ষেতে গিয়ে দেখা যায়, গাছগুলো প্রায় দুই ফুট পর্যন্ত লম্বা। সবুজ পাতার মরিচ গাছে লাল-সবুজ রংয়ের মরিচ ঝুলে রয়েছে। প্রত্যেকে গাছে মরিচ হওয়ায় গাছ যেন মাটিতে নুয়ে না পড়ে সেজন্য চিকন (সরু) শলা আকৃতির কাঠি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। প্রতি গাছে ৪০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত মরিচ ধরেছে। উদ্যোক্তা সেন জিয়েন গাওয়ের সাথে মরিচ ক্ষেতে পরিচর্যা করছেন রাসেল-রাকিবা দম্পত্তি। রাকিবা ক্ষেতে থেকে মরে যাওয়া মরিচরে চারা তুলে সেই স্থানে নিড়ানি দিয়ে মাটি নরম করে ভালো মরিচের চারা রোপন করছেন। রাসেল কোদাল দিয়ে জমির আগাছা পরিষ্কার করছেন এবং মাঝে মাঝে মাটি ঝরঝররা করছেন। ঝুঁড়ি দিয়ে মাটি এনে বীজতলার উপর ছিটিয়ে দিচ্ছেন উদ্যোক্তা সেন জিয়েন গাও। প্রত্যেক গাছেই ৩ থেকে ৪ কেজি মরিচ ধরেছে। কাজের ফাঁকে পাকা লাল মরিচগুলো ঝুড়ি হাতে নিয়ে গাছ থেকে সংগ্রহ করছে রাকিবা।
স্থানীয় সাইফুল ইসলাম প্রধান বলেন, একজন চাইনিজ নাগরিক টপ্রায় ৫ মাস আগে আমারই এক চাচাতো ভাইয়ের জমি লিজ নিয়ে সেখানে চাইনিজ মরিচ চাষ করেছে। আমি প্রথমে বিশ^াস করতাম না। পরে অনেকেই দেখতে আসে শুনে আমিও আগ্রহ নিয়ে একদিন দেখতে গিয়েছিলাম। সত্যি প্রতিটা গাছে অনেক লম্বা লম্বা মরিচ ধরেছে। মরিচগুলো বাঁকা হওয়ায় দেখতে সুন্দর লাগে। আবার অনেক মরিচ একবারেই সোজা লম্বা। মরিচের ভাড়ে গাছ ঝুলে পড়ার আশঙ্কা থাকায় প্রতিটা গাছে কাঠি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। শখের বসে আমি ২/৩টা মরিচ গাছ থেকে ছিড়ে নিয়ে আসছিলাম। তবে, আমাদের দেশীয় মরিচ থেকে একটু কম ঝাল। ক্ষেতের পরিচর্যাকারী রাসেল বলেন, চাইনিজদের প্রজেক্টে কার করছি প্রায় ছয় মাসের মতো। এখানে চাইনিজরা আসার মূলত উদ্দেশ্যে হলো তারা এখানে তাদের দেশের যে সবজি আছে এটা চাষ করবে। তারা বাংলাদেশে চাইনিজ সবজি পাচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রচুর পরিমানে চাইনিজ আছে। তারা নিজেরাই চাষ করে নিজেদের রেস্টুরেন্টগুলোতে বিক্রি করবে। প্রকোশলী আলম প্রধানের মাধ্যমে তারা (চাইনিজ) এ এলাকায় আসে। রোপন করার পর এ পর্যন্ত প্রায় ৭ থেকে ৮ বার মরিচ সংগ্রহ করছি। এতে প্রায় ৮ থেকে ১০ মনের মতো বাজারে বিক্রি করেছি ঢাকায় চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। এখানে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি ছিল, যা বাংলাদেশে এখানো উৎপাদন হয় না। সবগুলো চাইনিজ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। মরিচের পাশাপাশি লেটুস পাতা চাষ করছি। তাদের দেশের আরো শাক-সবজি রোপণ করতেছি। এগুলোর নাম আমি জানি না। রোপণ করার পর কেমন ফলন হয় বলতে পারভ। লিজ দেওয়া জমির মালিক আতিকুর রহমান প্রধান বলেন, চাইনিজ নাগরিক সেন জিয়েন গাও আমার তিন বিঘা জমি বাৎসরিক হিসাবে লিজ নিয়েছে। লিজকৃত জমিতে সে চাইনিচ (ইন্দোনেশিয়া জাত) মরিচ চাষ করে ভালো ফলন পাচ্ছে। তিনি আরও জমি লিজ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
উদ্যোক্তা সেন জিয়েন গাও বলেন, চাপাই-কোপাই মরিচ ইন্দোনেশিয়ায় একটি জাত। এ মিরচ বিভিন্ন চায়নিজ খাবারে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর। এখানে মরিচসহ অন্যান্য কৃষি ফসল চাষ করে ভালো ফলন পাচ্ছি। উৎপাদিত পণ্য আমরা খোলা বাজারে বিক্রি না করে নিজেদের রেস্তোরাঁয় ব্যবহার করি। আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হলেও ভবিষ্যতে বড় পরিসরে চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ইন্দোনেশীয় জাতের চাপাই কোপাই মরিচ দেখতে অনেকে জমিতে এসে আমার সাথে কথা বলে। খুব ভালো লাগে। এলাকার লোকজন অসছে, দেখছে। নিজস্ব রেস্তোরাঁর চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই তিনি বাংলাদেশে এর চাষ শুরু করেন। পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করলেও ভবিষ্যতে বড় পরিসরে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে তার। শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, চাপাই কোপাই মরিচ ইন্দোনেশিয়ান একটি জাত। এ জাতের মরিচ প্রায় ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে। ঝাল কম হওয়ায় ক্যাপসিকামের ফ্লেবারযুক্ত থাকায় এটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টগুলোতে এর চাহিদা বেশি। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পোকা-মাকড় ও রোগ বালাই দমনে চাইনিজ চাষিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি তিনি এ জমি থেকে ভালো ফলন পাবেন এবং লাভবান হবেন। আমরা আমাদের স্থানীয় কৃষকদেরকেও এ ধরনের মরিচের আবাদের জন্য উৎসাহিত করছি। যেহেতু ফলন বেশি এবং বাজার মূল্যে বেশি হওয়ার কারণে কৃষকেরা লাভবান হবেন। সেজন্য কৃষকদেরকে স¤প্রসারনে কাজ করে যাচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। সঠিক বাজার ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে ‘চাপাই-কোপাই’ মরিচ ভবিষ্যতে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
- দৈনিক আমাদের কণ্ঠ: দেশজুড়ে, প্রকাশিত সংবাদ, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম, সারাদেশ