নিজস্ব প্রতিবেদক :
গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দুর্নীতিবাজ মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী গোপনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ভারত হয়ে তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ট এই দুর্নীতিবাজ হাসিনার প্রায় পুরো সময় শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকা লোপাট করেছে। এ নিয়ে সে সময় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমিতে প্রায় নিয়মিত শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের গুণগান নিয়ে সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। ভারতের বিভিন্ন নাট্যদল ও নাট্যশিল্পীদের এনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান করাসহ নাট্যোৎসবের নামে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির স¤প্রসারণে নিরন্তরভাবে তিনি কাজ করেছেন। নাট্যাঙ্গণে আওয়ামী ও ভারতের গুণগান গাওয়া তথাকথিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের নিয়ে এসব হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির বিকাশে নিরন্তর কাজ করে গেছেন লিয়াকত আলী লাকী। এদের মধ্যে অন্যতম তথাকথিত অভিনেতা ও নির্দেশক খন্দকার শাহ আলম অন্যতম। এই শাহ আলম আওয়ামী লীগের পুরো সময়ে শিল্পকলার কফি হাউস চালিয়েছেন।
সন্ধ্যার পর কফি হাউসে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের সমর্থক গোলাম কুদ্দুস, নাসিরউদ্দিন ইউসূফ বাচ্চু, ম. হামিদসহ অন্যান্যদের নিয়ে আওয়ামী লীগের গুণগান গাইতেন। তাদের সহযোগিতায় ও প্রশ্রয়ে লিয়াকত আলী লাকীর অত্যন্ত ঘনিষ্ট এই খন্দকার শাহ আলম শিল্পকলায় দাপট দেখাতেন। ৫ আগস্টের পর তিনি ভোল পাল্টে প্রথমে এনসিপি এবং পরবর্তীতে বিএনপি সাজার অবিরত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অথচ হাসিনার পতনের পরদিন তিনি অনেকের সামনে বুক ফুলিয়ে বলেছেন, আমি বিএনপি করি না। কোনোদিন করিওনি। করবও না। সেই শাহ আলম এখন পুনরায় বিএনপি সেজে শিল্পকলায় তার অবস্থান অটুট রাখার নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ফড়িয়ার মতো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে নানা তোষামোদী এবং জাসাসসহ বিএনপির নেতাদের ‘আমি আপনাদের লোক’ বলে ম্যানেজ করছেন। এ চেষ্টায় তিনি কিছুটা সফলও হয়েছেন। তার গঠিত ‘জাতীয় পিঠা উৎসব পরিষদে’র ব্যানারে অসময়ে (গত ২৪ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত) জাতীয় পিঠা উৎসবের আয়োজন করে। ২০০৮ সাল থেকে হাসিনার পতনের আগ পর্যন্ত খন্দকার শাহ আলম এই পিঠা উৎসবের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লোপাট করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমির আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতায় নিজের পকেট ভারি করার জন্য তিনি এই উৎসব করে আসছেন। হাসিনার শাসনামলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা যৌথভাবে এই আয়োজন করার জন্য দশ লাখ টাকা করে অনুদান দিত। শাহ আলম পিঠা উৎসব উদযাপন কমিটিতে আহŸায়ক হিসেবে বরাবরই স্বৈরাচারের দোসর ম. হামিদকে রাখতেন। তিনি নিজে হতেন সদস্য সচিব। যাবতীয় অর্থ খরচ তিনি নিজে করতেন। কিন্তু পিঠা উৎসবে কত লাভ বা ক্ষতি হতো তা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কিংবা শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক্ষকে দিতেন না। বলতেন, লস হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিল্পকলা একাডেমির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং সংস্কৃতি অঙ্গণের লোকজন ও মেলায় স্টল নেয়াদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিল্পকলা একাডেমির বড় মাঠে প্রতিবছর পিঠা মেলায় প্রায় শ’খানেক ছোট-বড় স্টল থাকে। ছোট স্টলের ভাড়া গড়ে পনের থেকে বিশ হাজার এবং বড় স্টলের পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা করে নেয়া হয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমির আর্থিক অনুদানসহ দশ দিনব্যাপী মেলা থেকে আয় হয় প্রায় ত্রিশ লাখ টাকার মতো। এর মধ্যে ডেকোরেটর দিয়ে স্টল তৈরি, ব্যানার তৈরি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের লাইট-সাউন্ড বাবদ খরচ হতো সর্বসাকুল্যে ছয়-সাত লাখ টাকা। বিদ্যুৎ বিল ও সাংস্কৃতি অনুষ্ঠানের শিল্পীদের পারিশ্রমিক শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বহন করে। বাকি তেইশ থেকে চব্বিশ লাখ টাকা খন্দকার শাহ আলম ও আয়োজক কমিটির লোকজন লোপাট করে দিতেন। কোনো ধরনের হিসাব দিতেন না। বলতেন, লস হয়েছে। কত লস হয়েছে, কীভাবে লস হয়েছে, তার কোনো হিসাব দেয়ার প্রয়োজনবোধ করতেন না। লিয়াকত আলী লাকী ও ফ্যাসিবাদের সমর্থক তথাকথিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের কারণে, এ নিয়ে বিগত বছরগুলোতে খন্দকার শাহ আলমকে কেউ কিছু বলতে পারত না। হাসিনার পতনের পর লাকীসহ অন্যরা পালিয়ে কিংবা আত্মগোপনে চলে গেলে খন্দকার শাহ আলম যেন অথৈ সাগরে পড়ে যান। শিল্পকলা থেকে অনেকটা বিতাড়িত হন। এই ফড়িয়ার কোন পেশায় জড়িত, তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারে না। বলা আবশ্যক, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমি দেশের পিঠা সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার জন্য এই উৎসবে সহযোগিতা করে আসছে। এখানে পিঠা উৎসবের আয়োজকদের লাভ-ক্ষতির কোনো বিষয় নেই। আয়োজকদের দায়িত্ব, অনুদানপ্রাপ্ত অর্থ কীভাবে, কোথায় ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব দেয়া। স্টল ভাড়া দিয়ে আয় করার বিষয় এখানে জড়িত নয়। অথচ আয়োজক কমিটি স্টল ভাড়া দিয়ে বিপুল অর্থ আয় করে। এই আয় খন্দকার শাহ আলম ও আয়োজকরা মেরে দিতেন। ফ্যাসিস্টের এই চিহ্নিত দোসর শাহ আলমকে বিগত অন্তরবর্তী সরকার পিঠা উৎসবের অনুমতি দেয়নি। পরিতাপের বিষয়, এই শাহ আলমের পকেট সংগঠন জাতীয় পিঠা উৎসব পরিষদকে নির্বাচিত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমি অসময়ে পিঠা উৎসব আয়োজনের অনুমতি ও অনুদান দিয়েছে। শাহ আলম এই অনুমতি কীভাবে পেল, তা নিয়ে শিল্পকলা একাডেমি ও ফ্যাসিবাদবিরোধী বিক্ষুব্ধ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা এখন প্রশ্ন তুলেছেন। জানা যায়, শাহ আলম ভেবেছিলেন, ক্ষমতায় জামায়াত-এনসিপি জোট আসছে। কিন্তু যখন দেখলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তখন থেকে তিনি বিএনপি সাজার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। দিনের পর দিন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ধর্ণা দিতে থাকেন। বিএনপি ও জাসাসের বিভিন্ন নেতাদের কাছে গিয়ে বলা শুরু করেন, তিনি বিএনপি করেন এবং এ কারণে আওয়ামী লীগের আমলে নির্যাতিত ছিলেন। অথচ আওয়ামী লীগের আমলে তিনি কেমন ছিলেন, তা উপরে বর্ণিত হয়েছে। বিএনপির অনেকে তাকে সেভাবে চেনেন না বলে তাকে বিশ্বাস করেছেন। ফলে তারা পিঠা উৎসবের সাথে জড়িত হন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমিও অনুমতি দেয়। ধুরন্ধর শাহ আলম এবারের পিঠা উৎসবে তার পকেট সংগঠন জাতীয় পিঠা উৎসব পরিষদের আহŸায়ক করেন জাসাসের সাবেক সভাপতি রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরীকে। উৎসবের সাথে জড়িত করেন জাসাসের অনেককে। এর মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের এই দোসর নিজেকে অনেকটা বিএনপি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। এ ব্যাপারে পিঠা উৎসব পরিষদের আহŸায়ক রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরীর কাছ থেকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি জানতাম না খন্দকার শাহ আলম এমন। আমাকে আরও অনেকে তার ব্যাপারে বলেছে। তার সাথে আমি আর নেই।
- দৈনিক আমাদের কণ্ঠ: দেশজুড়ে, প্রকাশিত সংবাদ, শীর্ষ সংবাদ, সংবাদ শিরোনাম, সারাদেশ