মো.ইউসুফ আলী-
নির্বাচন কমিশন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ বা পথ নকশা ঘোষণা করেছে। গত বৃহস্পতিবার ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচন হবে ফেব্রæয়ারির প্রথমার্ধে এবং তফসিল ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে। অপরদিকে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। শুক্রবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে এ মন্তব্য করেন তিনি। ইসি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ঘরে ফেরার আর কোনো পথ খোলা নেই। সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, এর দায় নির্বাচনি কর্মকর্তাদেরও বহন করতে হবে। জীবন ঝুঁকির মুখে পড়লেও নির্বাচনে কোনো ধরনের অনিয়ম বা ফাঁকিবাজি বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সামনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এই নির্বাচন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তার মতে, সব ধরনের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে সুষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তবু তারা মনে করে, এত বড় একটা কর্মযজ্ঞ সম্পাদন নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জের। যা মোকাবিলার আত্মপ্রত্যয়ী দৃঢ়তা তাদের আছে। প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর সুবিবেচনা, সহযোগিতা এবং সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান ইসির এ নির্বাচনি কর্মপরিকল্পনাকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি। জামায়াতের মতে, বিষয়টিতে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। তাদের মতে, এ রোডম্যাপ গতানুগতিক ও বিভ্রান্তিমূলক। এনসিপি মনে করে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে বিভিন্ন দল। নির্বাচন কমিশনের এমন ঘোষনার পরও নির্বাচন প্রসঙ্গে জনমনে ধোয়াশা রয়েই গেছে। কারন ’২৪শের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ছাত্রদের নেতৃত্বাধিন গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি সংবিধান পরিবর্তন ও সংস্কারের আগে নির্বাচন চায় না। দলীয় প্রধান তরুণ নেতা নাহিদ ইসলাম বিদেশে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে মনে হয় নির্বাচন হবে না। দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কথা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না। তার মানে হতে দেওয়া হবে না। তাছাড়া দলটি সংসদ নির্বাচনের আগে গণপরিষদ নির্বাচন চায়। তবে গণপরিষদ নির্বাচন কোন আইনের ভিত্তিতে হবে, সেটা অবশ্য তারা বলছেন না। এ ছাড়া জুলাই সনদের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দফায় দফায় বৈঠক করেও সমঝোতায় আসতে পারেনি। অপরদিকে নির্বাচন প্রসঙ্গে ড. মোহাম্মদ ইউনূসকে নিয়েও নানান জন নানা কথা বলছেন।
এ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গগণ ও। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নিয়ে দুয়েকটি পক্ষ ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদও। শুক্রবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘রাষ্ট্রীয় মদদে মানবতাবিরোধী অপরাধের কৌশল উন্মোচন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা বলেন। এর আগে বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানাও স¤প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের এক টক শোতে বলেছেন, বিএনপি ছাড়া কিছু রাজনৈতিক দল চাইছে নির্বাচনটা যতদূর সম্ভব পেছানো যাক। তারা চাইছে আরেকটু হাতে সময় পেলে হয়তো কিছু আসন বেশি পেতে পারে। এজন্য তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাহানা নিয়েও হাজির হচ্ছে। তাই কোনো কোনো দল এমনও দাবি করছে পিআর পদ্ধতি যদি না হয় তাহলে তারা নির্বাচনেই যাবে না। আবার পতিত আওয়ামী লীগ সমর্থিত কিছু লোকজন এখনও বলছে যে, এসরকার নির্বাচনই দিবে না। বরং তারা নানা টাল বাহানায় সময় ক্ষেপন করে নিজেদের পাকাপোক্ত করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। এছাড়াও নানা জনের নানা মত পোষন করে নির্বাচন নিয়ে গুঞ্জন সৃষ্টি করেই চলছে। ফলে এসব কথাবার্তা দেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের ধোয়শার সৃষ্টি করছে।
তবে এসব কিছু উপেক্ষা করেই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যে রোডম্যাপ ঘোষনা করা হয়েছে এতেকরে সংসদ নির্বাচন আয়োজনের এটি আরেক ধাপ অগগ্রগতি বলেই আমরা মনে করছি। কারন অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানানো হয়ে আসছিল। ইসির রোডম্যাপ ঘোষনার মাধ্যমে অন্ত:ত তারতো অবসান ঘটল। আমরা ইসির এ ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। আমরা এও মনে করিযে,এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নির্বাচনের পথে যাত্রা শুরু করল। নির্বাচন কমিশন প্রবাসী ভোটাররা যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। এটাও ইতিবাচক বলে মনে করি। তবে তাদের উচিত হবে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও সীমানা নির্ধারণের কাজটি শেষ করা। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অনেক নতুন দল নিবন্ধনের আবেদন করে প্রাথমিক যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। এ কাজ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করি। দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষই মনে করেন যে,অতীতের তিনটি নির্বাচনে জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। এগুলোর কোনোটি বিনা ভোটের নির্বাচন ছিল, কোনোটিতে দিনের ভোট রাতে হওয়ার গুরুতর অভিযোগ আছে। এ অবস্থায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন করা কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ তারা তখনই করতে পারবে, যখন প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বিক সমর্থন ও সহযোগিতা পাবে। তারপরও আমরা একথা বলতেই পারি যে,নির্বাচন না চাওয়ার পেছনে অনেক কারণই থাকতে পারে। কারণ যা-ই হয়ে থাকুক না কেন, দেশের জন্য এটা মঙ্গলজনক হবে না। দেশ ও জনগণের ভালো চাইলে জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। কোনো কারণে নির্বাচনের ট্রেন আটকে গেলে দেশ জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে, যার ধকল সামলানো কঠিন। যারা নির্বাচন চাইছেন না বা নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে অন্য কোনো মতলব হাসিল করতে চান, আখেরে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। একুল-ওকুল দুকুলই হারাবেন। আমরা মনে করি, নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মনস্তাত্তি¡ক চাপও বাড়ল। নেতারা জুলাই সনদের দাঁড়ি-কমা নিয়ে যতই বাহাস করুন না কেন, জনগণ ভোটের জন্য উন্মুখ। সমঝোতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাই মুখ্য।
তবে আশার কথা হল এই যে ড. ইউনূস উদ্যমী, আশাবাদী এবং বিশ্ববরেণ্য একজন জ্ঞানী মানুষ। তিনি ান্ত:ত তার এই ক্ষুদ্র দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক ভাবে বিশ^ বাসীর কাছে ছোট হতে হয় এমন কোন কাজ করবেন না। সেদিক বিচনা করলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সরকার ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে অবিচল বলেই প্রতীয়মান হয়। লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার আগপর্যন্ত নির্বাচন প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান পরিষ্কার ছিল না। যৌথ ঘোষণার পরও দোদুল্যমানতা ছিল বলে অনেকে মনে করেন। সরকারের ঘনিষ্ঠ কোনো কোনো সুশীল বলছিলেন যে সরকারের ভিতরে আরও একটি সরকার রয়েছে। ভিতরের সেই সরকার সম্ভবত ড. ইউনূসের কাঁধে বন্দুক রেখে উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছিল।
তারা বলতে চাইছিল যে এই সরকারই জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত। গণ অভ্যুত্থানকে তারা নির্বাচনের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছিল। তারা অন্তত পাঁচ বছর এই সরকার থাকার তত্ত¡ প্রচার করছিল। দুয়েকজন উপদেষ্টাও অনুরূপ কথা বলতে শুরু করেছিলেন। সে ধরনের অমিাংশিত কিছু কিছু বিষয় এখনও পুরোপুরি পরিস্কার নয় বলেই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে বলে মনে করছেন দেশের সাধারণ জনগণ। তবে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে যে যা-ই বলে বেড়াক না কেন আমরা মনে করি ড.ইউনূসের নেতৃত্বাধিন সরকার এমন একটি সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করুক, যা দেশের অতীতের সকল নির্বাচনী রেকর্ড ভেঙ্গে মনে রাখার মত একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। দেশের সচেতন জনগণ, সংশ্লি¬ষ্ট সংস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সব অংশীজনের সমন্বিত সর্বোচ্চ সদিচ্ছা ও সহযোগিতায় ‘ইতিহাস সেরা’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। নির্বাচিত সরকারের হাতে ন্যাস্ত হোক রাষ্ট্র পরিচালনার গণতান্ত্রিক গুরুদায়িত্ব। যার অপেক্ষায় রয়েছে জাতি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেশবাসীর এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।