নিজস্ব প্রতিবেদক
নোয়াখালীর সদর উপজেলার ৫নং বিনোদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামে পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে অপহরণ, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও বাদী ও তার দুই ছেলেকে একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভুক্তভোগী শোয়েব হোসেন প্রকাশ খোকন (৫০) এ ঘটনায় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তিনি নোয়াখালীর সদর উপজেলার ৫নং বিনোদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ লক্ষীপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা মরহুম মজিবুল হক ফরেষ্টার দক্ষিণাঞ্চলের একজন পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে খোকন লিখিত বক্তব্যে বলেন, পিতার মৃত্যুর পর তাদের পরিবারের বিপুল সম্পত্তি—যার মধ্যে সোনাপুর বাজারের দোকানভিটি, বেকারি, কাঠের আড়ৎ, ট্রাক, বাস ও চরের জমিজমা ছিল— তার অবর্তমানে তার বড় ভাইয়েরা বিক্রি করে দেন। পরবর্তীতে তারা এলাকায় দখল, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
তিনি দাবি করেন, স্থানীয় কয়েকটি আলোচিত দখল ও সহিংস ঘটনার সঙ্গেও তাদের নাম জড়িত ছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা জামাল উদ্দিনের বাড়ি ও পুকুর দখল, সাবেক বিডিআর সদস্য নুরুল হুদার জমির গাছ কেটে নেওয়া, গোলাম মাওলা চৌধুরীর পুকুর দখল এবং স্থানীয় এক ব্যক্তির চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টার অভিযোগও তোলেন তিনি।
খোকনের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ভাই মোঃ ইউনুস ও মৃত ভাই মোঃ ইসমাইল অতীতে সোনাপুর রেলস্টেশনে ট্রেন ডাকাতি ও পুলিশের অস্ত্র লুটের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। ওই ঘটনায় চারজন জিআরপি পুলিশ সদস্য নিহত হন বলেও তিনি দাবি করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করে লাকসাম জিআরপি থানায় নিয়ে যায় এবং রিমান্ড শেষে তাদেরকে নোয়াখালী জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
তিনি আরও বলেন, জামিনে মুক্তির পর তারা বিদেশে চলে যান। একপর্যায়ে ইউনুস বিদেশ থেকে ফিরে আদম ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন এবং বিভিন্ন মানুষকে ইতালি পাঠানোর নামে অর্থ আদায় করেন। ওই যাত্রাপথে খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তার মধ্যে স্থানীয় মোশাররেফ ও মুন্সিগঞ্জের দুইজন উল্যেখযোগ্য।
খোকন অভিযোগ করেন, বাড়িতে কেউ না থাকায় তার ভাইয়ের কর্মকাণ্ডের দায়ভার এসে পড়ে তার ওপর। বিভিন্ন সময় পাওনাদাররা তাকে মারধর, নির্যাতন ও জিম্মি করে খালি স্ট্যাম্প ও চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এমনকি জমিজমা বিক্রি করে মানুষের পাওনা পরিশোধ করতেও বাধ্য হন তিনি।
তার দাবি, তার ছেলেকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ইউনুস তার কাছ থেকে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেন। পাশাপাশি ভাইয়ের বাড়িঘর দেখাশোনা ও নির্মাণকাজের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, সম্প্রতি পুকুরে মেশিন বসানোকে কেন্দ্র করে তার ভাই ইসমাইলের ছেলেদের সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এতে খোকন বাধা দিলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ও তার ছেলেদের উপর হামলা চালানো হয়। পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসী লোকজন এনে তার দুই ছেলে ইমন (২৪) ও দিহান (২১)-কে প্রকাশ্য দিবালোকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে অপহরণ করে সোনাপুর কাঠপট্টি এলাকায় নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
তিনি জানান, ঘটনার সময় ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় কোনো সাক্ষ্মী না পেয়ে স্থানীয় মসজিদের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজে অপহরণের সত্যতা পেয়ে অপহরণকারীদেরকে ২ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে খোকনের দুই ছেলে ইমন ও দিহানকে থানায় হাজির করতে নির্দেশনা দিলে অপহরণকারীরা খোকনের দুই ছেলে ইমন ও দিহানের মাথার ছুল কেটে বেদড়ক মারধর ও হাত-পায়ের আঙ্গুলে সুঁই ঢুকিয়ে ক্ষ্যান্ত হয়নি। তার দুই ছেলের পকেটে ২০টি করে ৪০টি ইয়াবা টেবলেট ঢুকিয়ে ইয়াবা বিক্রয়কারীর আপবাদ দিয়ে তাদেরকে সোনাপুর ফাঁড়ি থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখলে চিকিৎসার জন্য তাদের নোয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। এবং চিকিৎসা শেষে তাদের জবানবন্দি নিয়ে খোকনের জিম্মায় বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
এ ঘটনায় পুলিশ খোকনকে বাদী করে অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ১৪৪৮(৩)/১, তারিখ ০৩ মার্চ ২০২৬। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩/৩২৩/৩৬৫/৩৭৯/৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয় এবং ১ নম্বর আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পুলিশ অপহরণ ও চাঁদাবাজিতে সম্পৃক্ত সবাইকে আসামি করেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে মামলা দায়েরের পর থেকেই তাকে ও তার পরিবারকে মামলা তুলে নিতে হুমকি প্রদান করছেন। রোমানিয়া থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তার।
খোকনের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতেও হত্যা চেষ্টা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও হামলার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নেতা মশিউর রহমান বাবুকে হত্যাচেষ্টা মামলায় জেল খাটার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এছাড়া ছোট ভাই আরমান হোসেনের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা ও জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
খোকন বলেন, “আমি ও আমার পরিবার বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। অপহরণের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত আসামিদেরকে গ্রেফতার ও অপহরণে ব্যবহারিত এম্ভুলেন্সটিকে সনাক্ত করে দ্রুত আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”